||মোহাম্মদ অলিদ সিদ্দিকী তালুকদার||
আজ ১৭ রমজান। ঐতিহাসিক বদর দিবস। ইসলামের চিরস্মরণীয় ও গৌরবময় একটি অধ্যায় হলো বদরযুদ্ধ। মক্কার অদূরে বদর নামক স্থানে এ মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যে প্রথমযুদ্ধ। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে তথা দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান এ প্রান্তরেই সংঘটিত হয়েছিল মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যকার এ ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র মুসলমানের মোকাবেলায় শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হয় কাফির বাহিনীর সহস্রাধিক সশস্ত্র সৈন্যকে। আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে সরাসরি তিন থেকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে মুসলমানদের সাহায্য করা হয়। এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে মহাবিপ্লব সাধিত হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনে এ যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফোরকান’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বদরযুদ্ধে আবু জাহেল, উতবা, শায়বাসহ মোট ৭০ জন কাফির নিহত হয়। আরো ৭০ জন কাফির মুজাহিদদের হাতে বন্দি হয়। অন্যদিকে ১৪ জন মুসলিম মুজাহিদ বীরবিক্রমে লড়াই করে শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন। বন্দীদের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর ক্ষমাসুলভ আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময় অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
মক্কা বিজয়:-
বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয় মদীনায় হিজরতের মাত্র ১ বছর ৬ মাস ২৭ দিন পরে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (স.)-কে মদীনা থেকে বের করে দেবার জন্য নানাবিধ অপচেষ্টা চালায়। যেমনভাবে তারা ইতিপূর্বে হাবশায় হিজরতকারী মুসলমানদের সেখান থেকে বের করে দেবার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু সেখানে তারা ব্যর্থ হয়েছিল।
এ যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩ জন হওয়া সত্ত্বেও তারা মক্কার সুসজ্জিত প্রায় এক হাজার কাফিরের ওপর বিজয়ী হয়েছিলেন। মহান আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য থাকাতেই তা সম্ভব হয়েছে। এ যুদ্ধে কাফির বাহিনীর ৭০ জন মুজাহিদদের হাতে নিহত এবং তাদের ৭০ জন মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন শাহাদত বরণ করেন। মুসলমানদের পক্ষে এই যুদ্ধের প্রধান বীর ছিলেন আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)। তিনি একাই ৩৬ জন কাফিরকে হত্যা করেছিলেন যাদের মধ্যে অনেকেই ছিল নেতৃস্থানীয় কাফির সর্দার ও তৎকালীন আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খ্যাতিমান যোদ্ধা ।
বদর যুদ্ধের গুরুত্ব:-
বদর যুদ্ধ ছিল হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী অথচ একটি অসম যুদ্ধ। ইসলামের টিকে থাকা না থাকার ফায়ছালাকারী যুদ্ধ। কেননা একটি সুসজ্জিত এবং সংখ্যায় তিনগুণ অধিক ও প্রশিক্ষিত সেনাদলের সাথে অপ্রস্ত্তত, অসজ্জিত এবং সংখ্যায় তিনগুণ কম এবং বাস্তভিটা হারা মুহাজির ও নওমুসলিম আনছারদের এ যুদ্ধে জয় লাভ ছিল এক অকল্পনীয় ব্যাপার। এ কারণেই এ যুদ্ধের দিনটিকে পবিত্র কুরআনে ‘ইয়াওমুল ফুরক্বান’ বা কুফর ও ইসলামের মধ্যে ‘ফায়ছালাকারী দিন’ (আনফাল ৮/৪১) বলে অভিহিত করা হয়েছে।
বদরের যুদ্ধ ছিল কাফেরদের মূল কর্তনকারী ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা দানকারী। বদর যুদ্ধ ছিল মুসলিম ও মুশরিকদের মধ্যে সর্বপ্রথম মুখোমুখি সশস্ত্র যুদ্ধ, যে যুদ্ধে বিজয়ের ফলে মুসলমানদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি পায়। দলে দলে লোকেরা ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। এমনকি মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ প্রকাশ্যে ইসলাম কবুলে বাধ্য হয়। এছাড়া এ যুদ্ধের পরে কাফের সমাজে এমন আতংক প্রবেশ করে যে, তারা আর কখনো বিজয়ের মুখ দেখেনি।
বদরের যুদ্ধের বিজয় ছিল মক্কা বিজয়ের সোপান স্বরূপ। এই সময় শা’বান মাস থেকে কা’বার দিকে কিবলা পরিবর্তিত হয় এবং বদর যুদ্ধের মাত্র ছয় বছর পরেই ৮ম হিজরীর ১৭ই রামাযান তারিখে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে যা পূর্ণতা লাভ করে।
বদর যুদ্ধের শিক্ষা:-
ধৈয্যের শিক্ষা মক্কায় পরিবেশ প্রতিকুলে থাকায় সেখানে সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পক্ষান্তরে মদীনায় পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এবং এখানে সবাই রাসূলের নেতৃত্ব মেনে নিতে মৌখিক ও লিখিতভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার ফলে মুসলমানেরা চালকের আসনে থাকায় রাসূলকে সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। এতে বুঝা যায় যে, বিজয়ের সম্ভাবনা ও পরিবেশ না থাকলে যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়ে ছবর করতে হবে। যেমনটি মাক্কী জীবনে করা হয়েছিল।
বিনা কারণে যুদ্ধের অনুমতি নেই বদরের যুদ্ধ ছিল মূলতঃ
আত্মরক্ষামূলক। আবু জেহেলকে বদরে মুকাবিলা না করলে সে সরাসরি মদীনায় হামলা করার দুঃসাহস দেখাত। যা ইতিপূর্বে তাদের একজন নেতা কূরয বিন জাবের ফিহরী সরাসরি মদীনার উপকণ্ঠে হামলা করে গবাদিপশু লুটে নেবার মাধ্যমে জানিয়ে গিয়েছিল। এতে বুঝা যায় যে, আত্মরক্ষা এবং ইসলামের স্বার্থ ব্যতীত অন্য কোন কারণে কাফেরদের সাথে সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি নেই।
আল্লাহর সাহায্যই সবচেয়ে বড় সাহায্য সংখ্যা ও যুদ্ধ সরঞ্জামের কমবেশী বিজয়ের মাপকাঠি নয়। বরং আল্লাহর উপরে দৃঢ় ঈমান ও তাওয়াক্কুল হ’ল বিজয়ের মূল হাতিয়ার। পরামর্শ সভায় কয়েকজন ছাহাবী বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে যুদ্ধ না করে ফিরে যাবার পরামর্শ দিলে আল্লাহ ধমক দিয়ে আয়াত নাযিল করেন (আনফাল ৮/৫-৬)। এতে বুঝা যায়, আল্লাহর গায়েবী মদদ লাভই হ’ল বড় বিষয়। ¯্রফে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যুদ্ধে নামলে আল্লাহ স্বীয় ফেরেশতা মন্ডলী পাঠিয়ে সরাসরি সাহায্য করে থাকেন। যেমন বদর যুদ্ধের শুরুতে রাসূলের বালু নিক্ষেপের মাধ্যমে (আনফাল ৮/১৭) অতঃপর ফেরেশতাদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছিল (আনফাল ৮/৯)।
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা শিক্ষা বদরের যুদ্ধ আমাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হতেও শেখায়। বদরের এ দিনটিকে আল্লাহ স্মরণীয় হিসাবে উল্লেখ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন বদরের যুদ্ধে। অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হ’তে পার’ (আলে ইমরান ৩/১২৩)।
রাসূলুল্লাহ (স.) এর দু‘আ কবুল ও বিজয়ের ঘোষণা:-:
যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় পড়ে কেঁদে কেঁদে এরূপ দু‘আ করেন :
ইয়া আল্লাহ্! এ অল্প সংখ্যক মুসলমান যদি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়, তাহলে দুনিয়াতে তোমার ইবাদত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। এ দৃশ্য দেখে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)বলেন :ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আপনি মাথা উঠান। আল্লাহ্ তা‘য়ালা আপনার দু‘আ কবুল করেছেন। তখন মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করে রাসূলুল্লাহ (স.) বিজয়ের সংবাদ জানিয়ে দেন।
অর্থ : “অচিরেই এদল পরাভূত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাবে।, (সূরা আল-ক্বামার- ৪৫) উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি পাঠ করে যুদ্ধে জয়লাভের সুসংবাদ দেন।
পরিশেষে বলতে চাই এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বদর দিবস থেকে আমরা অনেক কিছুই শিক্ষা অর্জন করতে পারি সেই তৌফিক দান করুন আমীন । তাড়ি সাথে মহান আল্লাহ তায়ালার হুকুম আহকাম মোতাবেক আমাদের জীবন পরিচালিত করার জন্য তৌফিক দান করুন আমীন আমীন ছূম্মা আমীন ।