নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাবা ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মাদারীপুরের শিবচরের বাহাদুরপুরের শফিকুল ইসলাম নিজের পরিশ্রমে গড়ে তোলেন ইসলাম গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বসবাস শুরু করেন নারায়ণগঞ্জের অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত জামতলায়। ভালোই চলছিল ব্যবসা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরে হঠাৎ করে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। শফিকুলের পুত্র মনিরুল ইসলাম-এই দৃশ্যপট বদলানোর নায়ক। মনিরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারীরও নায়ক। ১০১ কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে পরিশোধ না করে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যার এখন সুদসমেত প্রায় ২০০ কোটি টাকার উপরে। শুধু তাই নয়, মনিরুল ইসলাম চাঁদাবাজিতেও নেমেছেন। তার বিরুদ্ধে শুধু ফতুল্লা থানায়ই ৪টি চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এতকিছুর পরেও মনিরুলের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি প্রশাসন। তিনি দম্ভ করে বলে বেড়ান, ‘ডিসি-এসপি আমার পকেটে।’
ধর্নাঢ্য শিল্পপতির পুত্র হয়েও হঠাৎ করে এমন রূপে কী করে এলো মনিরুল। এমন প্রশ্ন এখন জনমনে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনিরুল ইসলামের মালিকানাধীন মেসার্স এইচ.এস ফ্যাশনের বিপরীতে ধর্মগঞ্জের ২২ শতাংশ জমি, মনিরুল ও তাঁর ৪ ভাইয়ের নামে বিসিকের মেসার্স মুন নীট ওয়্যারের বিপরীতে ১০ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে লোন নেন। সেই টাকা দিতে না পাড়ায় নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ অর্থঋণ আদালতে ২টি মামলা করেছে (মামলা নং-৪৯ ও ৫০/ ২০১৪) সোনালী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ কর্পোরেট শাখা। মামলা ২টিতে মনিরুল ইসলামকে বিবাদী করে ১০১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার টাকার ঋণখেলাপি দেখানো হয়েছে। সেই সাথে ব্যাংক আদালতের কাছে ১২ শতাংশ হারে ওই টাকার সুদ সহ ফেরতের আর্জি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারী এ ব্যাংকের সুদসমেত এখন মনিরুল ইসলামের মালিকানাধীন দুই প্রতিষ্ঠানে কাছে ব্যাংকের পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এছাড়াও অন্যান্য বাংকেও রয়েছে তাদের ঋণ।
এ ব্যাপারে সোনালী ব্যাংকের উর্ধতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লোনের টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০০৯ সালে মনিরুল ইসলামদের ত্রৈমাসিক কিস্তির ব্যবস্থা করে দেয়া হয়ে ছিল। সেই টাকাও আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বন্ধককৃত সম্পত্তি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু ক্রয়ের আগ্রহী কাউকে না পেয়ে বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। তাই মামলায় গিয়েছি।
তবে মনিরুল ইসসলাম নিজেকের ইসলাম গ্রুপের পরিচালক দাবি করে এসব অভিযোগের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেন। কিন্তু তাদের ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, মনিরুলের এখন কোন ব্যবসাই নেই।
মনিরুলের ফুফা শফিউদ্দিনের দেয়া তথ্যমতে, মনিরুলের বাবা ইসলাম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পাওয়ার কয়েক বছর পর মনিরুল সকল শিল্প কারখানা বন্ধ করে ৮ বছর আগে বিদেশে চলে গিয়েছেন। এখন ইসলাম গ্রুপর ভবনগুলো ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানী ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাঁর এখন কোন ব্যবসা নেই।’
শুধু প্রতারণাই নয় চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটানোর একের পর এক অভিযোগ উঠছে মনিরুলের বিরুদ্ধে। মনিরুলের বাবা জীবিত থাকতে মাদারীপুরের একটি মাদ্রায় নিয়মিত চাল-ডালের খরচ দিতেন। কিন্তু তার বাবা মারা যাবার পরে সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে ফোন গালিগালাজ করেন। এমনকি তাকে বাসায় ডেকে এনে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে তাকে জঙ্গি বানিয়ে পুলিশে দিবেন বলেও শাসান। শুধু তাই নয়, চাঁদা দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন তার দুই ফুফাতো ভাইও। মেহেদী হাসান ও সুজন আহম্মেদ মহসিনের অভিযোগ দুই ভাইয়ের কাছে ৫৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদার দাবিতে নির্যাতন করতে থাকেন। পরে দুই ছেলেকে বাচাঁতে নগদ ২৫ লাখ টাকা ও ৬ লাখ টাকার চেক দিয়ে আসেন শফিউদ্দিন।
শফিউদ্দিনের দু’ছেলে কিংবা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সাথেই নয়, গত ডিসেম্বর মাসে আজাদ রিফাত ফাইবার্স লিমিটেডের মালিক আবুল কাশেম এবং তাঁর পরিবারকেও হুমকি দিয়ে আসছেন। এছাড়া মনিরের আপন চাচাতো ভাইয়ের কাছেও দাবি করেছেন ৬ লাখ টাকা।
এসব ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একে একে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ ৪টি অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি জন্মস্থান মাদারীপুরেও তাঁর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এক ভুক্তভোগী। কিন্তু এতো অভিযোগের পরেও তাঁর টিকিটিও ছুঁতে পারেনি কেউ। প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানকেও তিনি তোয়াক্কা করেন না বলে পরিচিতদের শাসান।
মনিরের বিরুদ্ধে মামলা নেয়ায় উল্টো ফতুল্লা মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই নালিশ করেছেন মনিরুল ইসলাম। ফলে পুলিশও কিছুটা পিছু হটেছে। এ কারণে ভুক্তভোগীদেরও শঙ্কা বাড়ছে।
যদিও ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন বলেন, ‘অভিযুক্ত মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে সে পলাতক। তাকে ধরতে অভিযান চলছে।