নিজস্ব প্রতিবেদক◊◊
রাজধানীর গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারে ঘটল ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সাততলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮-তে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল সূত্র ও জেলা প্রশাসন সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (৭ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারের নর্থ-সাউথ রোডের ১৮০/১ হোল্ডিংয়ে সাততলা ভবনে এ ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা শতাধিক। তাদের ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ অবস্থায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিস্ফোরণের পরই উদ্ধার কাজে অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট। বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থল থেকে আহতদের হাসপাতালে নেয়ার কাজ করেছে। এ ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও স্থানীয়রাও উদ্ধার কাজ করেছেন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আরও মানুষ থাকতে পারে বলে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। অনেকেই তাদের স্বজনদের হাসপাতাল ও মর্গে না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কাছে রয়েছেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় উদ্ধার কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রেখেছে ফায়ার সার্ভিস।
সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় আবারও উদ্ধার কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
নিহত ১৮ জনের মধ্যে রয়েছেন- মো. সুমন (২১), ইসহাক মৃধা (৩৫), মনসুর হোসেন (৪০), মো. ইসমাইল (৪২), আল আমিন (২৩), রাহাত (১৮), মমিনুল ইসলাম (৩৮), নদী বেগম (৩৬), মাইনউদ্দিন (৫০), নাজমুল হোসেন (২৫), ওবায়দুল হাসান বাবুল (৫৫), আবু জাফর সিদ্দিক (৩৪), আকুতি বেগম (৭০), মো. ইদ্রিস মীর (৬০), নুরুল ইসলাম ভুইয়া (৫৫) ও হৃদয় (২০), সিয়াম (২০) ও সম্রাট। নিহতদের মরদেহ ঢামেকে রাখা আছে।
বিস্ফোরণ না নাশকতা :
ঘটনাস্থলে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিতে আরও লোক আটকা আছেন বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সেনাবাহিনীর ৫৭ ইঞ্জিনিয়ার্স বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান মেজর কায়সার বারী তুষারও নাশকতার আলামত মেলেনি বলে জানিয়েছেন। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘গুলিস্তানে বিস্ফোরণের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বোমা বা বিস্ফোরক ধরনের কিছুর আলামত পাওয়া যায়নি।
এদিকে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনও একই ধরনের তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে বিস্ফোরক দ্রব্যের কোনো আলামত মেলেনি। তবে তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।’
তবে বিস্ফোরণের ঘটনায় নাশকতার সন্দেহের কথা জানিয়েছেন র্যাবের ডিজি খুরশীদ হোসেন।
মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এলে তার কাছে সাংবাদিকরা ‘বিস্ফোরণটি নাশকতা কিনা’, জানতে চাইলে র্যাব ডিজি বলেন, ‘ধারণা করে বলা ঠিক হবে না। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী লক্ষ করলে একটু সন্দেহ থাকতেই পারে, যে অন্য কিছু কাজ করছে কিনা। তবে র্যাবের গোয়েন্দারা কাজ করছে।’
ঘটনাস্থলে বিস্ফোরক কিছু পাওয়া গেছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে কয়েকটি কক্ষ আছে, ঢুকতে পারলে বলা যাবে।
সিদ্দিকবাজারে ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ জমে থাকা গ্যাসের কারণে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাজউক চেয়ারম্যান। এ সময় তিনি বলেন, ‘অনেক সময় জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এখানেও জমে থাকা গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে।’
ঘটনাস্থল থেকে রাজউকের পরিচালক (অঞ্চল-৫) হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই মুহূর্তে রাজউকের পক্ষ থেকে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রাজউক চেয়ারম্যান ভবনটির নকশা, ব্যবহার ও অন্যান্য বিষয় ঠিক ছিল কিনা, তা যাচাই-বাছাইয়ে একটি তদন্ত কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
আগামীকাল থেকে কমিটি কাজ শুরু করবে বলে জানান তিনি।
এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় মরদেহ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঢাকা জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে ১৩টি মরদেহ স্বজনদের বুঝিয়ে দিয়েছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের এনডিসি মো. রহমতউল্লাহ বলেন, ‘আমাদের কাছে মরদেহ বুঝে নেয়ার জন্য আবেদন জমা হয়। এক এক করে মরদেহগুলো আমরা স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দিচ্ছি। কাজ শেষ হলে সব মরদেহ বুঝিয়ে দেয়া হবে।
তিনি জানান, সুরতহাল শেষে লাশগুলো বুঝিয়ে দিতে পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন।
বিস্ফোরণের ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। ভয়াবহ এ বিস্ফোরণের ঘটনায় দেয়াল ভেঙে রাস্তায় এসে পড়েছে। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়কের গাড়িও। হতাহত হয়েছেন বিভিন্ন গাড়ির যাত্রী ও পথচারীরাও। এরপরই নিরাপত্তার স্বার্থে গুলিস্তান থেকে নর্থ-সাউথ রোড পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে।
এর আগে, শনিবার (৪ মার্চ) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অক্সিজেন কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় সাত জনের মৃত্যু হয়। আর রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবে নিহত হন তিন জন।
তবে ধারণা করা হচ্ছে-জমে থাকা গ্যাস লিকেজ এর কারণে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।